জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে আসন্ন বাজেটে সরকারের ৪২ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব ও অতি উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ‘জাতীয় বাজেটে তারুণ্যের অংশীদারত্ব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি। আসিফ মাহমুদ হুঁশিয়ারি দেন যে, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে দেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে এবং আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ আরও প্রশ্ন তোলেন, আসন্ন বাজেটে অনুৎপাদনশীল খাত ও বিশেষ থোক বরাদ্দে ব্যয় বৃদ্ধির সরকারি ঘোষণা ইতিবাচক হলেও, এর অর্থায়ন কোথা থেকে হবে তা স্পষ্ট নয়। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিলেও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত নাগরিকেরা নিয়মিতভাবে মোটা অঙ্কের কর পরিশোধ করছেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেন, একজন সাধারণ গাড়িচালক বছরে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা কর দেন, এমনকি মোটরসাইকেল চালকদের উপরও বার্ষিক করের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে।
সরকারের জনস্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার অভিযোগ তুলে আসিফ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাম্প্রতিক নিয়োগ এবং আর্থিক খাতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন প্রমাণ করে যে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ট্রেন ইতিমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে এবং তা আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। এই গণ-আকাঙ্ক্ষা ফ্যাসিবাদের চিরতরে বিলোপ ঘটাবেই। যারা পুরোনো ও গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে, বাংলাদেশের সচেতন জনগণ তাদের সবাইকে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।’
সেমিনারে অনলাইনে চাকরি খোঁজার প্রতিষ্ঠান ‘বিডিজবস’–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাসরুর অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি প্রশিক্ষণের নামে হাজার কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে। তিনি প্রচলিত এসব প্রশিক্ষণকে অর্থ অপচয়ের শামিল উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকারও এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। প্রথাগত প্রশিক্ষণের পরিবর্তে যুবকদের সরাসরি ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করে বিডিজবসের সিইও বলেন, সরকার ২১-২২ বছর বয়সী তরুণদের জাপান বা চীনের মতো দেশে গিয়ে বৈশ্বিক মানের দক্ষতা অর্জনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে তিনি নেপালের মতো উদ্ভাবনী উপায়ে তরুণদের বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সেমিনারে বলেন, একদিকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে কারাগার খুলে দিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে (আইভী রহমান) বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার ভবিষ্যৎ অধিকার আদালতই নির্ধারণ করবে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও অভিযোগ করেন যে, মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত না করে বিএনপির কিছু নেতা জামায়াতকে দমনের বিষয়ে গোপন বৈঠক করছেন। তিনি বর্তমান সরকারের একগুঁয়ে আচরণের সমালোচনা করে বলেন, দুই শতাধিক আসন পেয়ে সরকার জনগণের কথা না শুনে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করছে।
সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন, হত্যার বিচার এবং বাজেটে তরুণদের কর্মসংস্থানের সঠিক ব্যবস্থা না করলে সরকারকে জনগণ সহযোগিতা করবে না। তাদেরও পূর্ববর্তী সরকারের মতোই পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ তিনি ভারত থেকে মুসলিম পরিচয়ের কারণে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ট্যাগ দিয়ে পুশব্যাক করাকে দক্ষিণ এশিয়ার একধরনের জাতিগত নিধন (অ্যাথনিক ক্লিনজিং) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও বলেন, বিএসএফ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘বর্ডার কিলিং’ না বলে ভারতের ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার বয়ানকে সমর্থন করছেন, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম সেমিনারে বলেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠীর সংকট ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকার উদাসীন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ৫৪ বছর ধরে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে চাঁদাবাজিকে কর্মসংস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যা ৫ আগস্টের পরেও চলমান রয়েছে।
‘জাতীয় বাজেটে তারুণ্যের অংশীদারত্ব: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এই সেমিনারে কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি গড়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। জাতীয় যুবশক্তির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী ফরহাদ সোহেলের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির উপপ্রধান আবদুল্লাহ আল ফয়সাল, জাতীয় যুবশক্তির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. তুহিন মাহমুদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আয়েশা আহমেদ এবং জ্যেষ্ঠ সহসাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত।