অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
আমাদের সবার জীবনে শৈশব এক বিশেষ রঙিন অধ্যায়, আর ঈদের আনন্দ সেই সময়কে আরও ঝলমলে করে তুলত। বড় হওয়ার পর সেই সোনালি দিনের ঈদকে আমরা প্রতিনিয়ত খুঁজে ফিরি। কুষ্টিয়া বন্ধুসভার একজন সদস্য তাঁর নানাবাড়িতে কাটানো শৈশবের ঈদের স্মৃতিচারণ করেছেন, যেখানে বাবার প্রবাসজীবনের কারণে তাঁর পুরো শৈশব কেটেছে।
ঈদের আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত উৎসবের আমেজ। বিকেলের দিকে মামা, তাঁর বন্ধুরা, আমি, আপু এবং পাড়ার সমবয়সী ছেলেমেয়েরা মিলে হাউই ফোটানোর প্রস্তুতিতে মেতে উঠতাম। বাড়ির আঙিনার জঙ্গল থেকে বড় বড় মানকচুর পাতা সংগ্রহ করে তাতে ছোট ছোট ছিদ্র করা হতো। এরপর শুকনো নারকেলের ছোবড়া জড়িয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে সন্ধ্যায় সেগুলোকে মাঠে নিয়ে যাওয়া হতো। মামা তাতে আগুন ধরিয়ে গোল করে ঘোরালে পাতার ছিদ্র দিয়ে আগুনের ফুলকি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত, যা আমরা ছোটরা মুগ্ধ চোখে দূর থেকে হাততালি দিয়ে উপভোগ করতাম।
রাত নামতেই শুরু হতো মেহেদি পরানোর আয়োজন। খালাম্মা পরম যত্নে সবার হাতে মেহেদির নকশা এঁকে দিতেন। নতুন জামাগুলো বারবার বের করে দেখা আর আনন্দের আতিশয্যে কখন যে রাত কেটে যেত, কখন ঘুমিয়ে পড়তাম, তা টেরই পেতাম না।
ঈদের সকালে আম্মু গরম পানি দিয়ে গোসল করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দিতেন এবং আতর মেখে দিতেন। নানি তাঁর হাতের মুঠোয় গুঁজে দিতেন সালামি। এরপর নানা-মামাদের সঙ্গে দল বেঁধে ঈদগাহের পথে রওনা দিতাম। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতাম।
গ্রামের সেই ঈদের মাঠ, হাস্যোজ্জ্বল মুখ আর চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশ আজও চোখের সামনে ভাসে। মেলা থেকে বাঁশি, খেলনা, মিষ্টি আর রঙিন বেলুন কিনে আনন্দভরা মন নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। দুপুরে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া, গল্প আর হাসির শব্দে পুরো বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠত, যা ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
আজ আমরা সবাই বড় হয়েছি, জীবিকার তাগিদে ছড়িয়ে পড়েছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। খালাম্মার বিয়ে হয়েছে, ছোট মামাও সংসার পেতেছেন। তবে বড় মামা আর আমাদের মাঝে নেই, তাঁর শূন্যতা আজও প্রতিটি ঈদে শৈশবের সেই আনন্দকে এক নীরব বিষাদে ঢেকে দেয়। আজও নানাবাড়িতে গেলে পুরোনো উঠান, মাঠ আর অসংখ্য স্মৃতি বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা জাগিয়ে তোলে।