প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণুর আঘাতের পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়
আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর পূর্বে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছিল এক বিশাল গ্রহাণু। এর আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এক চরম ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসে। সংঘর্ষের ফলে প্রচণ্ড উত্তপ্ত পাথরের খণ্ড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা আকাশে এক বিশাল মাশরুম মেঘের সৃষ্টি করে। এর প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর ওপরের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রায় ২২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। মেক্সিকো উপসাগর থেকে মাইলের পর মাইল উঁচু সুনামি ঢেউ পৃথিবীর মহাসাগরগুলোকে ওলট-পালট করে দেয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দাবানল, যা বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, উদ্ভিদ ও অসংখ্য প্রাণীকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তীব্র শক ওয়েভ সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
এই প্রাথমিক ধাক্কার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সংঘর্ষের ফলে নির্গত সালফার ও অন্যান্য ক্ষতিকর কণা বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে উঠে সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দেয়, যার ফলস্বরূপ শুরু হয় বিষাক্ত অ্যাসিড বৃষ্টি। প্রায় এক দশক ধরে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে না পারায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং অধিকাংশ গাছপালা মারা যায়। এই মহাবিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে উড়ন্ত পাখি ব্যতীত ডাইনোসরসহ পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে প্রশ্ন জাগে, এমন চরম প্রতিকূল পরিবেশেও পাখি, কচ্ছপ বা স্তন্যপায়ীর মতো কিছু প্রাণী কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছিল?
বিজ্ঞানীরা জানান, সেই ভয়াবহ দিনে প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তাদের আকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। টাইরানোসরাস রেক্স বা ট্রাইসেরাটপসের মতো বিশাল আকৃতির ডাইনোসর এবং সাগরের দানবীয় সরীসৃপগুলো গ্রহাণুর আঘাতের মুহূর্ত থেকেই মারা যেতে শুরু করে। এদের বিশাল শরীরের কারণে প্রাথমিক বিস্ফোরণের ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হয়নি, এবং মহাবিপদের সময় কোনো নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকার সুযোগও ছিল না। উপরন্তু, সংকটের সময়ে টিকে থাকার জন্য এদের যে বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন ছিল, তা প্রকৃতিতে অবশিষ্ট ছিল না।
অন্যদিকে, ডাইনোসরদের রাজত্বকালে যেসব স্তন্যপায়ী প্রাণী বা টিকটিকি টিকে গিয়েছিল, এদের আকার ছিল বড়জোর একটি সাধারণ বেজির মতো। এই ছোট আকারের কারণেই তারা মাটির নিচে বা পাথরের খাঁজে গর্ত খুঁড়ে আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়েছিল, যা তাদের গ্রহাণুর তাত্ক্ষণিক আগুন এবং দীর্ঘমেয়াদী ধুলার ঝড় থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কচ্ছপ বা মাছের মতো ছোট জলজ প্রাণীরা পানিতে আশ্রয় নিয়েছিল এবং তাদের খুব কম খাবারের প্রয়োজন হওয়ায় তারা অনাহার থেকে রক্ষা পায়।
বর্তমান পাখিদের পূর্বপুরুষেরা সেই কঠিন সময়ে টিকে গিয়েছিল মূলত তাদের ছোট শরীর এবং উড়ার ক্ষমতার কারণে। তাদের ডানার পেশি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে যেকোনো বিপদ দেখলেই তারা দ্রুত উড়ে দূরে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারত এবং সহজেই নতুন খাবারের সন্ধান পেত। এছাড়া, তাদের ছানারাও খুব দ্রুত বড় ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠত, ফলে মা-বাবাকে দীর্ঘকাল ধরে বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য অতিরিক্ত কষ্ট করতে হতো না। এই অসাধারণ গুণাবলির কারণেই শত বিপদের মধ্যেও তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
ধ্বংসযজ্ঞের পর প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে খাদ্যাভ্যাসও একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। গ্রহাণুর আঘাতের পর প্রায় এক দশক ধরে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে না পারায় সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে অধিকাংশ গাছপালা মারা যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তৃণভোজী ডাইনোসর এবং তাদের শিকার করা মাংসাশী ডাইনোসরদের ওপর। খাবারের অভাবে তারা দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমনকি কিছু ছোট আকৃতির টিকটিকি ও কচ্ছপও এই সময়ে টিকে থাকতে পারেনি, কারণ তাদের বেঁচে থাকা পুরোপুরি সবুজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
স্থলভাগের তুলনায় সাগরের গভীর তলদেশ এবং নদীর পরিবেশ গ্রহাণুর প্রাথমিক ধাক্কা থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও, সেখানেও সূর্যালোকের অভাবে এককোষী উদ্ভিদ বা প্ল্যাঙ্কটন মারা যাওয়ায় পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। এতে বড় সামুদ্রিক প্রাণীরা অনাহারে মারা যায়। এই চরম সংকটে কেবল তারাই টিকে ছিল, যারা পানির নিচে জমে থাকা মৃত প্রাণীর পচা অংশ বা জৈব বর্জ্য খেয়ে জীবনধারণ করতে পারত। সামুদ্রিক স্পঞ্জ এবং বিশেষ প্রজাতির হাঙর ছিল এই সহনশীল প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম।
যদিও অধিকাংশ গাছপালা মারা গিয়েছিল, মাটির নিচে থাকা বা ঝরে পড়া বীজ এবং পোকামাকড় কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়নি। ফলে যেসব পাখি বীজ খেত এবং যেসব ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত, তাদের খাদ্যের অভাব হয়নি। চরম আবহাওয়াতেও এই খাবারগুলো নষ্ট না হওয়ায় তারা সহজেই টিকে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যারা কেবল নির্দিষ্ট একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সবকিছু খেতে পারত, এই মহাবিপদে তাদের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ছিল। ‘পারগেটোরিয়াস কোরাসিস’ নামের একটি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী একই সঙ্গে পোকা, ফল ও বীজ সবই খেত। খাদ্যাভ্যাসের এই বহুমুখী গুণের কারণেই তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়নি। আজকের যুগেও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াইয়ে কাক বা র্যাকুনের মতো সর্বভুক প্রাণীরা এ কারণেই সহজে টিকে থাকে।
কিছু প্রাণী বেঁচে গিয়েছিল স্রেফ ভাগ্য এবং তাদের শিকারের টিকে থাকার গুণের কারণে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শক্ত খোলসযুক্ত খাবার চিবিয়ে খাওয়ার বিশেষ ক্ষমতা বা ‘ডুরোফ্যাজি’ কৌশলটি প্রাণীদের বেঁচে থাকার হার অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর পাশাপাশি দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা এবং বদলে যাওয়া পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার আচরণই মূলত এই প্রাণীদের পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। উল্লেখ্য, প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।