ইসরায়েলের উগ্রপন্থী ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির সামরিক বাহিনীকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক সম্মেলনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন।
নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েল হামাসের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে। তিনি বলেন, “গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা এখন আমাদের হাতে। আগে আমরা ৫০ শতাংশ এলাকায় ছিলাম, সেখান থেকে আমরা ৬০ শতাংশে পৌঁছেছি।” কট্টরপন্থী এই প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “আমার নির্দেশ হলো ধাপে ধাপে এগোনো। প্রথমেই ৭০ শতাংশে যেতে হবে। আপাতত এ লক্ষ্য নিয়েই আমরা শুরু করি।” এ সময় উপস্থিত উগ্রপন্থী ইহুদি দর্শকরা পুরো গাজা দখলের দাবি জানান।
গত এপ্রিলের শেষের দিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে কিছু মানচিত্র সরবরাহ করে, যেখানে দেখা যায় গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা আগেই ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গাজার আরও এলাকা ইসরায়েলের দখলে গেলে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি চরম বিপাকে পড়বেন, যারা বর্তমানে উপকূলীয় উপত্যকার সামান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, যার ফলে ইসরায়েলি সেনারা ‘ইয়োলো লাইন’ (হলুদ রেখা) নামক একটি সীমানায় পিছিয়ে গিয়েছিল। এর ফলে গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকে। গত মঙ্গলবার হামাস ইসরায়েলকে এই সীমানা সরিয়ে নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে বলেছে যে, এর মাধ্যমে ইসরায়েল প্রকাশ্যেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং জোরপূর্বক নতুন পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হামাসের মতে, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো গাজার ওপর নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করা, যা ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরানো ও সংঘাত কমানোর যেকোনো চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি গত অক্টোবরে কার্যকর হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে হওয়া এই চুক্তির শর্ত মেনে চলার কথা ছিল ইসরায়েল ও হামাস—উভয় পক্ষেরই। তবে বর্তমানে এর বাস্তবায়ন থমকে আছে, যা গাজা ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বুলগেরিয়ার কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ চলতি মাসের শুরুতে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যে, চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি না হলে এই ‘ইয়োলো লাইন’ একসময় সীমানাপ্রাচীর বা দেয়ালে পরিণত হতে পারে, যার ফলে গাজা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ম্লাদেনভ গাজার বর্তমান বাস্তবতার কথাও স্বীকার করে বলেন, সেখানে “এখনো বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন” এবং “ইসরায়েলি বিমান হামলার ভয়ে দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো”।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজায় বারবার হামলা চালিয়েছে। তারা অভিযোগ করে যে, হামাস নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং নিজেদের বাহিনীকে আবার সংগঠিত করছে, এর মধ্য দিয়ে হামাসই প্রথম যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। ফিলিস্তিনের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর ইসরায়েলের এসব হামলায় গাজায় ৮৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েল হামাসের সামরিক শাখার নেতা ইজ্জ আল-দিন আল-হাদ্দাদকে হত্যা করে। এর ১১ দিন পর আরেক হামলায় তাঁর উত্তরসূরিকেও হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে বলেন, “৭ অক্টোবরের হামলায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে হত্যার শপথ নিয়েছিলাম আমরা। আর আমরা সেটাই করব। তাঁরা যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁদের মৃত্যুদণ্ড অবধারিত।”
ম্লাদেনভ আরও বলেন, হামাসও তাদের অস্ত্র সমর্পণ বা ধ্বংস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, অথচ গাজার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার এই প্রধান শর্তটির ওপর। শর্ত অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী গাজার বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এরপর ইসরায়েলি বাহিনী গাজার দখল করা এলাকা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাবে। বেশ কয়েকটি দেশ গাজায় নিরাপত্তা বাহিনী পাঠাতে চেয়েছে, তবে ঠিক কবে এই বাহিনী মোতায়েন করা হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট সময়সীমা নেই। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নেও কোনো অগ্রগতি না থাকায় এই সুযোগে গাজার আরও বেশি এলাকা ক্রমশ দখলে নিচ্ছে ইসরায়েল এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত এই ভূখণ্ডে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করছে।